ডেট্রয়েট, ৭ জুন : ডেট্রয়েট শহরের কেন্দ্রস্থলের একটি রাস্তার মোড়ে স্টেফানি ক্যাটালফিও দু’হাত প্রসারিত করে চিৎকার করে বললেন, “মায়ের মতো আলিঙ্গন—একেবারে বিনামূল্যে!” মুহূর্তের মধ্যেই চামড়ার পোশাক, টুটু স্কার্ট, পশুর মুখোশ কিংবা ট্যাঙ্ক টপ পরা মানুষজন একে একে এগিয়ে এসে তাঁকে জড়িয়ে ধরেন এবং দীর্ঘক্ষণ আলিঙ্গনে আবদ্ধ থাকেন। “এর জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ,”—বললেন এক অংশগ্রহণকারী।
রবিবার অনুষ্ঠিত ‘মোটর সিটি প্রাইড প্যারেড’-এ আলিঙ্গন বিতরণের এই বিশেষ উদ্যোগে অংশ নেন ক্যাটালফিওসহ একদল স্বেচ্ছাসেবী মা-বাবা, যাঁরা নিজেদের পরিচয় দেন “ফ্রি হাগস” বা নিঃশর্ত ভালোবাসা ছড়িয়ে দেওয়ার কর্মী হিসেবে। তাঁদের এই উদ্যোগে অনুসৃত হয় একটি নীতি, যাকে তাঁরা বলেন “ডিজনি প্রিন্সেস রুল”—অর্থাৎ, সামনের ব্যক্তি যতক্ষণ না নিজে আলিঙ্গন শেষ করছেন, ততক্ষণ তাঁরা তাঁকে ছাড়েন না।
ওয়ারেন শহরের বাসিন্দা ক্যাটালফিও জানান, তিনি প্রতি বছরই LGBTQ+ সম্প্রদায়ের প্রতি সংহতি জানাতে এবং ভালোবাসা ছড়িয়ে দিতে প্রাইড উৎসবে অংশ নেন। তাঁর মতে, কোনো বিচার ছাড়াই আন্তরিক আলিঙ্গন অনেক মানুষের জীবনে গভীর আবেগ ও মানসিক প্রশান্তি এনে দেয়।
তিনি বলেন, “অনেকেই এসে বলেন, ওহ মাই গড! গত ১৫ বছরে আমি কোনো বাবার আলিঙ্গন পাইনি।’
রোববারের প্রাইড প্যারেডে ডেট্রয়েটের রাস্তাজুড়ে দেখা গেছে হাজার হাজার মানুষের অংশগ্রহণ। রংধনু রঙের পতাকা, সাজসজ্জা ও উৎসবমুখর পরিবেশে দিনটি পরিণত হয় বৈচিত্র্য, আনন্দ ও নিজেদের অস্তিত্বের স্বীকৃতির এক উজ্জ্বল উদযাপনে।
অংশগ্রহণকারীরা জানান, এই আয়োজন কেবল উৎসব নয়, বরং নিজের পরিচয়কে সাহসিকতার সঙ্গে প্রকাশ করার এবং সামাজিক স্বীকৃতির প্রতি এক দৃঢ় অঙ্গীকারের প্রতীক। সাউথগেটের বাসিন্দা ম্যাট গ্রাফ বলেন, “আমার মনে হয় এর বার্তাটি হলো—আমরা সংখ্যায় অনেক।” তিনি জানান, গ্রীষ্মজুড়ে তাঁর প্রাইড-সম্পর্কিত নানা অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, যা আগস্টে অ্যান আরবারের উদযাপন পর্যন্ত চলবে। গ্রাফ বলেন, "আমি এখানকার পরিবেশটা খুব ভালোবাসি। এর সবকিছুই আমার দারুণ লাগে।"
আরেক অংশগ্রহণকারী আয়েশা ওয়েলস, যিনি এবোনি টেইলরের স্টেট রিপ্রেজেন্টেটিভ নির্বাচনী প্রচারণায় সহায়তা করছিলেন, বলেন এই আয়োজন তাঁর জন্য আবেগঘন অভিজ্ঞতা ছিল। তাঁর ভাষায়, “মানুষ যে এখানে নিজের মতো করে থাকতে পারছে—বিষয়টি আমার খুব ভালো লাগে। এটি ভালোবাসার এক বিশাল বহিঃপ্রকাশ।”
প্যারেড শুরুর আগে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে মিশিগানের গভর্নর গ্রেচেন হুইটমার বলেন, LGBTQ+ সম্প্রদায়ের অধিকার ও সুরক্ষায় রাজ্যটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তিনি বলেন, “আমরা জানি প্রতিটি জয়ের বিপরীতে একটি প্রতিক্রিয়াও আসে। আমরা এটি দেশের রাজধানীসহ বিভিন্ন জায়গায় দেখতে পাই।”
তিনি আরও বলেন, অন্যান্য রাজ্যেও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে, যা বর্তমান সময়কে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। সেই সঙ্গে তিনি ভিন্ন রাজ্যে বসবাসরত, পরিচয় বা স্বীকৃতি নিয়ে সংকটে থাকা ব্যক্তিদের মিশিগানে আসার আমন্ত্রণ জানান, যেখানে তাদের “গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং স্বীকৃতি দেওয়া হয়”।
ওয়ারেন শহরের বাসিন্দা লুকাস হাইম তিন বছর আগে মেয়ে হেইলিকে নিয়ে ওয়াইমিং থেকে মিশিগানে চলে আসেন—নিজের ভাষায় যেখানে তিনি অবশেষে নিজের প্রকৃত পরিচয়ে বাঁচতে পারছেন। তিনি বলেন, “ওয়াইমিংয়ে আমাকে নিজের আসল পরিচয় লুকিয়ে রাখতে হতো।” এখন ডেট্রয়েট প্রাইড প্যারেডে দাঁড়িয়ে তাঁর পরনে ছিল একটি শার্ট, যেখানে লেখা—“Trans dads are hotter।” তাঁর মতে, এটি ছিল নিজের আত্মবিশ্বাস ও পরিচয় নিয়ে নির্ভয়ে থাকার প্রকাশ।
হাইম জানান, তাঁর মেয়ে হেইলির জন্মের আগেই তিনি বুঝতে পারেন যে তিনি একজন ট্রান্সজেন্ডার পুরুষ। শুরু থেকেই হেইলি তাঁকে ‘বাবা’ হিসেবেই জেনে এসেছে।
তিনি আরও বলেন, ওয়াইমিংয়ে তাঁকে প্রায়ই নিজের পরিচয় ব্যাখ্যা করতে হতো, কিন্তু মিশিগানে এসে সেই চাপ অনেকটাই কমেছে। তাঁর ভাষায়, “এখানে কেউ এসব নিয়ে প্রশ্ন তোলে না, কারণ কারো তাতে কিছু যায় আসে না।”
রবিবারের প্রাইড প্যারেডে হেইলির উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। সে উৎসাহ নিয়ে ছোট ছোট প্রাইড পতাকা সংগ্রহ করছিল এবং একসঙ্গে কয়েক ডজন পতাকা হাতে ধরে রাখে। বাবাকে নিয়ে কোনো নেতিবাচক মন্তব্য হলে সে সরাসরি বলে, “আমি ওসব পাত্তাই দিই না।”
বাবা-মেয়ের এই উপস্থিতি প্রাইড প্যারেডে পরিচয়, গ্রহণযোগ্যতা এবং পারিবারিক বন্ধনের এক মানবিক দৃষ্টান্ত হিসেবে উঠে আসে।
অ্যান আরবারের বাসিন্দা অ্যাডাম ও নিকোল উইলিয়ামস তাঁদের দুই সন্তান—৯ বছর বয়সী ম্যালকম এবং ৫ বছর বয়সী মার্কাসকে—নিয়ে ডেট্রয়েট প্রাইড প্যারেডে অংশ নেন। তাঁদের মতে, এই অভিজ্ঞতা সন্তানদের “বৈচিত্র্য সম্পর্কে বাস্তব ধারণা” দিতে সহায়তা করবে।
পরিবারটি রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে পতাকা নাড়িয়ে মিছিলকারীদের জন্য উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে। চারপাশের রঙিন পরিবেশ ও উৎসবমুখর ভিড়ের মধ্যে তাঁরা পুরো আয়োজনটি উপভোগ করেন।
নিকোল উইলিয়ামস বলেন, “আমরা চাই আমাদের সন্তানরা নানা ধরনের মানুষের সংস্পর্শে আসুক।” তিনি নিজেও LGBTQ+ সম্প্রদায়ের একজন সদস্য হিসেবে পরিচয় দেন এবং জানান, পরিবার হিসেবে তাঁরা এই সম্প্রদায়ের একজন প্রকাশ্য সমর্থক বা সহযোগী (ally) হিসেবে পাশে থাকতে চান।
তিনি আরও বলেন, “আমি জানি পরিস্থিতিটা অনেক সময় কঠিন বা ভারী মনে হতে পারে, তবে আমি আশাবাদী থাকাই বেছে নিয়েছি।”
Source & Photo: http://detroitnews.com
নিউজটি আপডেট করেছেন : Suprobhat Michigan

সুপ্রভাত মিশিগান ডেস্ক :